ময়নাতদন্ত

 

Bangla Kobita


দেহ উদ্ধার করেছে বেহালা থানা, এরপর ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে দেহটিকে। বেহালার নীরব বসু রোডের ১০নম্বর বাড়ি, পাড়ার লোকেদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গিয়েছে, যে মেয়েটির মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে তার নাম রূপা বিশ্বাস।বয়স ওই ২৬-২৭-এর মধ্যেই। দু'মাস আগেই রূপার বাবা দিবাকর বিশ্বাস গত হয়েছেন।পরিবারের সদস্য সংখ্যা বলতে ওই দুজনই। দিবাকর বাবুর স্ত্রী সোনালী দেবী, প্রায় বাইশ বছর পূর্বেই সংসার ত্যাগ করে চলে যান। মেয়ে এবং বাবা বাইশ বছর ধরে যথেষ্ট সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই নিজেদের জীবন অতিবাহিত করছিলো।প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ এটুকুই জানতে পেরেছিলো। এরপরে, রূপাদের একতলা বাড়ির একটি ঘর এবং সামনের একফালি বারান্দা সবটাই তদন্ত চালালো পুলিশে। তদন্তের রিপোর্ট হিসাবে বিশেষ কিছুই পাওয়া গেলো না যাতে কোনো প্রকার সন্দেহের উদ্বেগ হয়। তবে, একটি দিনলিপি উদ্ধার করা হলো, যাতে রূপা অনেক কথাই লিখে রেখে গেছে।

থানার বড় সাহেব ডায়েরিটিকে ভালোভাবে পড়লেন এবং সেই সূত্রেই তিনি কেসের রিপোর্ট প্রস্তুত করলেন। রূপার বয়স এই বছর ১৯-শে এপ্রিল ২৬ পূর্ণ হয়েছিলো।সে ছিলো পড়াশোনাতেও যথেষ্ট মেধাবী একজন ছাত্রী। রূপার বাবা অর্থাৎ দিবাকর বিশ্বাস পেশায় ছিলেন একজন ভ্যান চালক, পারিবারিক সূত্রে তাঁদের বিশেষ কেউ আর ছিলো না।দিবাকর বাবুর এক ভাই আছেন, তিনি থাকেন সুদূর মুম্বইতে, তাই সেভাবে যোগাযোগও নেই। স্ত্রী সংসার ত্যাগ করার পর থেকেই দিবাকর বাবু যেন সর্বহারা হয়ে পরেন, তাই সন্তানের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য সবটাই ভীষণ দায়সারা ভাবে পালন করতেন।অন্যদিকে রূপা ধীরে  ধীরে বয়ঃপ্রাপ্ত হতে থাকে, সত্যি বলতে তাঁর চোখে অনেক স্বপ্ন ছিলো। সে চেয়েছিলো ভবিষ্যতে সে একটা ভালো চাকরি করবে, তাঁদের এই অভাব অনটনে ঘেরা সময় একদিন কেটে যাবেই।পড়াশোনায় আগাগোড়াই ভালো হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল লাভ করে।মাধ্যমিক পাশ করার পর থেকেই রূপা বুঝতে পারে তাঁর  বাবার কাছে কিছু আশা করাটা একেবারেই উচিত নয়।

রূপা নিজের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য টিউশনি পড়াতে আরম্ভ করে।নিজের পড়াশোনার অধিকাংশ খরচই সে নিজে বহন করতো।দিবাকর বাবু যা আয় করতেন সংসার খরচ বাবদ তা খরচ হয়ে যেতো।

ক্লাস ইলেভেন রূপা যেখানে পড়তে যেতো, সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় অপরূপ সাহার। অপরূপ ছিলো তাঁর ক্লাসমেট। অপরূপ এবং রূপার বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়, কিন্তু দুজনের মধ্যে কেউই তা প্রকাশ করতে পারে না। তাঁরা দুজনই ক্রমশ সময়ের কালচক্রে বাঁধা পড়ে নিজেদের জীবনের জটিলতা থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে।দিবাকর বাবু শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন, ইদানিং তাঁদের দারিদ্রতার হারও বৃদ্ধি পেয়েছিলো। রূপা এক-এক সময় দিশেহারা হয়ে পড়ে যে কোনদিকে তাকাবে, একদিকে তাঁর নিজের পড়াশোনা অন্যদিকে তাঁর বাবার শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক অনটন।

দিবাকর বাবু ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন রূপার বিয়ে দেওয়ার, রূপা প্রতিবারই অমত করায় তা সম্ভবপর হয় নি।নারীজীবন যে বড়ই অদ্ভুদ, বিধাতা নারীকে সহ্য ক্ষমতা দিয়েছেন কিন্তু প্রকাশ ক্ষমতা যে সীমিত, তাই ভালোবাসা বোঝালেও তা প্রকাশ করতে পারে না। যদিও এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম দেখা যায়। যাইহোক, গ্রাজুয়েশন শেষ করে রূপা মাস্টার্স করেছিলো।ততদিনে রূপা আর অপরূপের দুরত্বটা অনেকখানি, তবে কেউই কারোর জীবনে সম্পূর্ণ  অস্পষ্ট হয়নি। রূপা ইতিমধ্যে নিজের জীবন সম্পর্কে আরও অনেক বেশি সচেতন হয়েছিলো এবং স্থির করেছিলো মিথ্যে কোনো কিছু আঁকড়ে বাঁচার চেয়ে সত্যির সঙ্গে লড়াই করাই শ্রেয়। তাই অপরূপের উপস্থিতিকে নিজের জীবন থেকে ধীরে মুছে ফেলতে চেষ্টা চালায় রূপা।

মাস্টার্স শেষ হলে, রূপা কল সেন্টারে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিলো।তখন দিবাকর বাবু একেবারেই বিছানা শয্যায়। বাবার শুশ্রূষা, সংসার সবকিছু সামলে নিয়ে চলতে হচ্ছিলো রুপাকে , তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সম্ভবপর হচ্ছিলো না। রূপার ২৬-তম জন্মদিনের ঠিক দু'মাস পরেই দিবাকর বাবুর মৃত্যু হয়। রূপা যেন সর্বহারা হয়ে পড়েছিলো।বিশাল বড় এই জীবনে আঁকড়ে বাঁচার খুঁটি বলতে তাঁর কাছে আর কিছুই ছিলো না। একা থাকতে থাকতে রূপা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলো, তাঁকে মানসিক ভাবে সাহায্য করার মতো কেউই ছিলো না।তাই একদিন  রূপা জীবনযুদ্ধে হার স্বীকার করে নিয়ে, নিজের শরীরটাকে পাখার সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো।পরদিন সকালে গোয়ালা যখন প্রতিদিনের মতো রূপাদের বাড়িতে এসেছিলো, অনেকবার দরজায় আঘাত করেও কোনো সাড়া পায় নি। 

সেই খবর সে পৌঁছে দিয়েছিলো পাড়ার ক্লাবে। তারপরই দরজা ভেঙে উদ্ধার হয় রূপার দেহ।

আসলে বাস্তবের এই চরম পরিণতির ছবি এঁকে দিয়েছিলো রূপার নিত্য জীবন।বন্ধু, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সব সম্পর্কই  বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলো,রূপার মন খারাপের দিনে।গল্প হোক কিংবা বাস্তব পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোকেও যত্নে রাখা প্রয়োজন, তা না হলে কালচক্রে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার উদাহরণ যে ক্রমবর্ধমান।

©মাম্পি মল্লিক


(বি.দ্র: গল্পের স্থান, কাল, চরিত্র এবং বিষয়-বস্তু সবটাই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই এবং থাকলেও তা কাকতলীয়!)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য