শুভা-কে প্রতিদানে

 নতুন বাংলা গল্প: শুভা-কে প্রতিদানে


Bengali Story


বি. সি.এস পরীক্ষায় পাশ করে, প্রায় ষোলো বছর হলো সার্ভিস করছে শুভম রায়।বর্তমানে আসানসোলে তাঁর পোস্টিং, দুই সন্তান বিভব ও অন্যান্য-কে নিয়ে তাঁর স্ত্রী রমা দক্ষিণ কলকাতার বেহালা অঞ্চলের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। শুভম বাবু প্রতি সপ্তাহের ছুটিতেই কলকাতায় আসেন, এবং পরিবারের সঙ্গে দু'দিনের ছুটি উপভোগ করে আবারও ফিরে যান, নিজের কর্মস্থলে। বিভবের বয়স এখন বারো বছর এবং অনন্যার নয়। দুই ভাইবোনই দক্ষিণ কলকাতারই একটি বিখ্যাত স্কুলে পড়ছে।শুভম বাবুর স্ত্রী অর্থাৎ রমা দেবী পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করে, বর্তমানে একটি স্বনামধন্য পাবলিশিং হাউসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।তাই, শুভম বাবু ও রমা দেবী দুজনই প্রায়, ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে দিনযাপন করে। অন্যদিকে তাঁদের সন্তান বিভব ও অন্যান্য নিজেদের স্কুল, টিউশন, এক্সট্রা কারিকুলাম শেষে যখন বাড়িতে ফেরে তখন বাড়ির পরিচারিকা শুভা, তাঁদের দেখাশোনা করে। প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেলো শুভা, রায় পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, কোনো দিনই তাঁর কাজকর্ম পরিবারের কোনো সদস্যকে অভিযোগের সুযোগ দেয়নি। তাঁর বয়স আন্দাজ ত্রিশের মধ্যেই, শ্যামবর্ণা,মুখটা গোলাকার এবং উচ্চতা প্রায় চার ফুটের মতো। দশ বছর পূর্বের এক বন্যায় তাঁর গ্রামের ঘর বাড়ি সব ভেসে যায়, আর ঠিক তাঁর পরের বছরই তাঁর বৃদ্ধ বাবার মৃত্যু ঘটে, তারপরই শুভা কলকাতায় চলে আসে। তাঁর কোনো এক দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ই তাঁকে পরিচারিকার কাজে রায় বাড়িতে নিযুক্ত করে দিয়েছিলো।


কাজকর্মে শুভার জুড়ি মেলা ভার, ঠিক তেমনই তাঁর প্রাণোচ্ছলতা বিভব ও অনন্যাকে ভীষণরকমভাবে আগলে রাখে। শনি ও রবিবারে শুভমবাবু বাড়িতে থাকে। তাই ওই দু'দিন রায় পরিবার ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে ডিনার সবটাই  একসঙ্গে করে থাকে। তা না হলে অন্যান্য দিন শুভা বিভব ও অনন্যাকে যথা সময়ে খাইয়ে দেয়, রমাদেবী কাজের চাপে বেশিরভাগ দিনই বাইরে থেকেই খেয়ে বাড়িতে ফেরে। এভাবেই তাঁদের জীবন বাধা ছকে চলতে থাকে। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা অনন্যার স্কুল থেকে ফোন আসে রমা দেবীর কাছে, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানায় অনন্যা হঠাৎই ক্লাস চলাকালীন অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে, তবে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়েছে অনন্যার, তাই অভিভাবক হিসেবে রমাদেবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, যাতে তৎক্ষণাৎ রমা দেবী অনন্যাকে নিজ তত্ত্বাবধানে নিতে পারে।রমাদেবী সংবাদ পাওয়া মাত্রই পৌঁছে যায় স্কুলে এবং অন্যান্যকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।কলিং বেলের শব্দে শুভা গিয়ে দরজা খোলে এবং দেখে যে রমাদেবী অনন্যার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুভা জিজ্ঞেস করে, "কী হলো? দিদিমণি! এখনও তো...."- কথাটা পুরোটা শেষ না হতেই, রমাদেবী শুভাকে নির্দেশ দেয় যেন এক্ষুনি এক গ্লাস  গরম দুধ অনন্যার ঘরে যেন সে পাঠিয়ে দেয়।পরদিন সকালে, বিভব স্কুলে বেরিয়ে যায় এবং রমাদেবীও যথাসময়ে কর্মস্থলের উদ্যেশ্যে রওনা দেয়।বাড়িতে  থাকে অসুস্থ্য অনন্যা এবং শুভা, আসলে গত রাত্রে ড.মিত্র এসে অনন্যাকে দেখে যায় এবং জানায় অনন্যার কিছুদিন রেস্ট প্রয়োজন, সে শারীরিক ভাবে ভীষণই দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুভা গত রাত্রে প্রায় সারাক্ষণই জেগে কাটিয়েছিলো, সারাক্ষন অনন্যার বিছানার পাশেই বসে থাকে সে। পরের দিনও ঠিক তাই, শুভা একমুহূর্তও অন্য জায়গায় যেতে পারে না অনন্যাকে একলা ছেড়ে।সেদিন রাত্রে রমাদেবী অফিস শেষে বাড়ি ফিরে প্রথমেই মেয়ের ঘরে চলে যায় এবং মেয়ের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে, তারপর, অনন্যা জানায়,"শুভাদিদি আজ সারাদিন আমার সঙ্গে ছিলো, অনেক গল্প করেছি আমরা আর একসঙ্গে অনেক্ষন কার্টুন দেখেছি... দিদি আমাকে আজ দু'বেলাই খাইয়ে দিয়েছে.... আর আমাকে গল্পও শুনিয়েছে!" হঠাৎই রমাদেবী লক্ষ করে যে অনন্যার গলার সোনার হারটি উধাও।সে অনন্যাকে জিজ্ঞাসাও করে, কিন্তু অনন্যা প্রত্যুত্তরে জানায়,"আমার সত্যিই মনে পড়ছে না মা!" রমাদেবী মুহূর্তের মধ্যেই যেন আন্দাজ করে ফেলে যে সোনার হার তবে চুরি গেছে। রমাদেবী তৎক্ষণাৎ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যায় এবং ফোন করে শুভমবাবুকে....

-হ্যালো! শুভম! বলছি....

-রমা! অনন্যা এখন কেমন আছে?

-হ্যাঁ! অনন্যা ভালো আছে... বলছি, একটা কথা বলার ছিলো, শোনো!

-কী হয়েছে রমা? তোমার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন?

-অনন্যার গলায় যে সোনার হারটা ছিলো, সেটা ওর গলায় আর দেখতে পাচ্ছি না।

-ভালোভাবে বাড়িতে খুঁজে দেখো।ঘরেই কোথাও রাখা আছে হয়তো, আর অনন্যাকেও জিজ্ঞেস করো।

-অনন্যা কিছু বলতে পারলো না, আমি ওকেই আগে জিজ্ঞাসা করেছি,ওর ঘরেও খুঁজেছি পাইনি, দেখি বাকি জায়গাগুলো খুঁজে।আমার ভীষণভাবে মনে হচ্ছে, শুভাই আজ বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগে হারটা সরিয়েছে।

-কি বলছো রমা!শুভা কেন একাজ করবে, ও এতদিন আমাদের বাড়িতে কাজ করছে, আজ হঠাৎ..... না!না! রমা তুমি বেশি ভেবে ফেলেছো।

-না! শুভম! অনন্যাও আমাকে বলেছে, আজ সারাদিন শুভা ওর কাছেই ছিলো, আমার মন বলছে শুভম ! শুভাকে চেপে ধরলেই হারের খোঁজ পাওয়া যাবে।

-না! রমা আগে প্রতিটা ঘর ভালোভাবে খোঁজো তারপর না হয় এসব ভাবা যাবে আর....

-তুমি সপ্তাহে দু'দিন বাড়িতে থাকো,তোমার পক্ষে সবটা বোঝা অসম্ভব।আমার দৃঢ় বিশ্বাস এ কাজ শুভার...এখন রাখছি, অনেক রাত হয়েছে।


তারপর রমা ফোনটা কেটে দেয়।তারপর রমা বাড়ির প্রতিটা ঘরে সোনার হারটি খুঁজতে থাকে, শুভা জিজ্ঞাসা করে,"কি হয়েছে দিদিমণি?এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেন তোমায়?" রমাদেবী প্রত্যুত্তরে শুভাকে বলে,"অনন্যা-র গলার সোনার হারটা কোথায় শুভা?আমি নিশ্চিত আজ গোটা বাড়ি ফাঁকা থাকায় তুই হারটা সরিয়েছিস।" শুভার চোখ দুটো একবারে স্থির হয়ে যায়, তাঁর দুই চোখ দিয়ে ক্রমশ জল বেরিয়ে আসতে থাকে। শুভার দুই গাল বেয়ে সেই জল নেমে আসে রায় বাড়ির মাটিতে। রমা যেন সেই মুহূর্তে মানবিকতার সব পাঠ ভুলতে বসে এবং শুভার দিকে বারে বারে ওই একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত শুভা তাঁর মৌনতা ভাঙে এবং বলে,"দিদিমণি! আমি এইবার তোমাদের থেকে ছুটি চাই, জানি এত সহজে তোমরা আমাকে ছেড়ে দেবে না।কিন্তু ঈশ্বর জানেন আমি নির্দোষ তাই,আমি অপেক্ষা করবো আসল সত্য-র।তবে তোমাদের বাড়িতে আমি আর কাজ করতে পারবো না।" -এই বলে সে ঘরের ভিতরে গিয়ে দরজা দেয়।

পরদিন সকালে শুভা নিজের কথা রাখে,সে বাড়ির একটিও কাজ করে না।এমনকি গত রাত্রি থেকেই সে ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে থাকছিলো। সেদিনই শুভমবাবু বাড়িতে আসেন, প্রতিবারের মতোই সাপ্তাহিক ছুটিতে।তার কিছুক্ষন পরেই রমাদেবীর ফোনে অনন্যার স্কুল থেকে ফোন আসে, ফোনে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়,"মিসেস রায়, গত পরশু যখন অনন্যা রায় অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলো,তখন তাঁর গলার সোনার হারটা কোনোভাবে স্কুল বেঞ্চে পড়ে গেছিলো। আমরা পরদিন স্কুলের স্টুডেন্টদের থেকে তা পেয়েছিলাম এবং তাঁরাই বললো যে হারটা নাকি অনন্যার। সো কাইন্ডলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা কালেক্ট করে নিয়ে যাবেন।" প্রত্যুত্তরে রমাদেবী বললো "শিওর এন্ড থ্যাংক ইউ!"

এরপর, শুভমবাবু যায় শুভার ঘরের দিকে, দরজায় দু'বার ধাক্কা দেওয়ার পরে শুভা দরজা খোলে।শুভমবাবু বলে,"আমাদের ক্ষমা করবে শুভা? সোনার হারটা পাওয়া গেছে, ওটা অনন্যার স্কুলে পড়ে গেছিলো। আমরা খুবই লজ্জিত, তুমি দয়া করে কাজটা ছেড়ে দিও না। রমাও তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।" এরপরে শুভা বলে,"অনেক ধন্যবাদ দাদাবাবু! আমি আমার সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি, কিছু সময়ের মধ্যেই রওনা দেবো।ভালো থাকবেন।" এবার, শুভমবাবু দেখলো যে, শুভার গালে চোখের জলের দাগটা তখনও স্পষ্ট।

©মাম্পি মল্লিক


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য